ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ ও ধারা । অষ্টম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য WBNOTES.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে বাংলা পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ ও ধারা । অষ্টম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ প্রদান করা হলো। শিক্ষার্থীরা এই অষ্টম শ্রেণির বাংলা অনুশীলনীর প্রশ্নের উত্তর –গুলি সমাধানের মধ্য দিয়ে তাদের পরীক্ষা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে।
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ ও ধারা । অষ্টম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ :
ধ্বনি পরিবর্তন:
ভাষার ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ একক হল ধ্বনি। উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দ মধ্যস্থ ধ্বনিগত যে পরিবর্তনকেই ধ্বনি পরিবর্তন বলে। এটি ভাষার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণত অসচেতনভাবে ঘটে এবং সময়ের সাথে সাথে শব্দের রূপ বদলে দেয়।
যেমনঃ ‘স্কুল’ শব্দটি দ্রুত উচ্চারণ করলে ‘ইস্কুল’-এর মতো শোনায়, যেখানে শব্দের শুরুতে একটি স্বরধ্বনি (‘ই’) যুক্ত হয়েছে।
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণঃ
ধ্বনি পরিবর্তনের কারণগুলি হল-
ক) বাগযন্ত্রের ত্রুটিঃ
ধ্বনি বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত হয়। বাগ যন্ত্রের ত্রুটি বা দুর্বলতা থাকলে ধ্বনি স্পষ্টরূপে উচ্চারিত হতে পারে না বা উচ্চারণ করা যায় না। এজন্য ধ্বনির মূল রূপটি বদলে যায়।
খ) দ্রুত উচ্চারণঃ
দ্রুত উচ্চারণ করতে গেলে ধ্বনি পালটে যেতে পারে। যেমন- ‘কোথা থেকে এলি’ এটি দ্রুত উচ্চারণ করতে গিয়ে হয়ে যেতে পারে-‘কোত্থেকে এলি’। ‘গভর্নমেন্ট’ পালটে হয়ে যেতে পারে ‘গম্মেন্ট’। আবার ‘পিশাচ’ হয়ে যায় ‘পিচাশ’ বা রিক্শা > রিশ্কা।
গ) উচ্চারণ সহজ করার প্রবণতাঃ
সহজ করে উচ্চারণ করতে গেলে ধ্বনি পালটে যেতে পারে। যেমন-‘এমন কর্ম আর করব না’-এটি সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে হতে পারে ‘এমন কৰ্ম্ম আর করবো না’। আবার জন্মেও দেখিনি > জম্মেও দেখিনি।
ঘ) আবেগঃ
আবেগের বহিঃপ্রকাশে কখনো-কখনো ধ্বনিকে পালটে দেয়। যেমন- মামা > মামু, কাকা > কাকু, জ্যাঠা > জেঠু। ইত্যাদির কারণে শব্দের ধ্বনি পালটে যেতে পারে।
ঙ) শ্বাসাঘাতঃ
শ্বাসাঘাত হল শব্দে কোনো ধ্বনির উপর উচ্চারিত শ্বাসের আঘাত বা জোর পড়া। শব্দের মধ্যে কোনো ধ্বনির ওপর শ্বাসাঘাত পড়লে মূল শব্দ থেকে ধ্বনি লুপ্ত হতে পারে কিংবা কোনো ধ্বনির আগমন ঘটতে পারে। যেমন – গামোছা > গামছা।
ঙ) ছন্দঃ
কবি-সাহিত্যিকরা কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য বা ধ্বনিসুষমা বজায় রাখার জন্য শব্দে ধ্বনির বদল ঘটাতে পারেন। যেমন – একটি রতন মোরে দিয়াছিল বিধি। রত্ন > রতন।
চ) আঞ্চলিকঃ
ভাষার আঞ্চলিক প্রভাব বা ডায়ালেক্টের কারণেও ধ্বনির রূপান্তর ঘটে। যেমন – গাড়ি > গারি। কোথাও কোথাও ভূ, র্ রূপে উচ্চারিত হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে শ’ ধ্বনি ‘ছ’ রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন – ‘শশিবাবু’ > ‘ছছিবাবু’।
ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মঃ
শব্দের মধ্যে ধ্বনির এই পরিবর্তন সাধারণত চার রকম ভাবে ঘটে। যথা-
ক) ধ্বনির আগমন
খ) ধ্বনির লোপ
গ) ধ্বনির রূপান্তর
ঘ) ধ্বনির স্থান বদল
ধ্বনির চারপ্রকার পরিবর্তন উভয় ধ্বনিতেই লক্ষ করা যায়-
স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে- স্বরের আগমন বা স্বরাগম, ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনের আগমন বা ব্যঞ্জনাগম। অনুরুপে স্বরলোপ, ব্যঞ্জনলোপ,স্বরের রূপান্তর, ব্যঞ্জনের রূপান্তর,স্বরের স্থানান্তর, ব্যঞ্জন এর স্থানান্তর,-এগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-
ধ্বন্যাগমঃ
ধ্বন্যাম হল শব্দে অতিরিক্ত ধ্বনির আগমন। উচ্চারণের সুবিধার জন্য কোনো শব্দে অতিরিক্ত ধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে ধ্বন্যাগম বলে।ধ্বন্যাগম দু প্রকার-
ক)স্বরাগম
খ) ব্যঞ্জনাগম
ক) স্বরাগমঃ
উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের মধ্যে অতিরিক্ত স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে স্বরাগম বলে।
যেমন- গ্রাম > গেরাম, স্কুল > ইস্কুল, স্টোভ > এস্টোভ ইত্যাদি।
স্বরাগম তিনপ্রকার –
i) আদি স্বরাগমঃ
শব্দের প্রথমে বা আদিতে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে আদি স্বরাগম বলে।
যেমন-স্কুল > ইস্কুল, স্টোভ > এস্টোভ ইত্যাদি।
ii) মধ্য স্বরাগমঃ
শব্দের মাঝে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে মধ্য স্বরাগম বা স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ বলে।
যেমন-রত্ন > রতন, গ্রাম > গেরাম ইত্যাদি।
iii) অন্ত্য স্বরাগমঃ
শব্দের শেষে অতিরিক্ত স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে অন্ত্য স্বরাগম বলে।
যেমন-ই > ইঞ্চি, বেশ > বেশি ইত্যাদি।
খ) ব্যঞ্জনাগমঃ
উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমনকে ব্যঞ্জনাগম বলে।
যেমন – উপকথা > রূপকথা, নানা > নানান, সীমা > সীমানা ইত্যাদি।
শব্দের মধ্যে ব্যঞ্জনধ্বনির আগমনের অবস্থান অনুসারে ব্যঞ্জনাগম তিনপ্রকার। যথা –
i) আদি ব্যঞ্জনাগমঃ
শব্দের আদি অর্থাৎ প্রথমে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে আদি ব্যঞ্জনাগম বলে। যেমন-উপকথা > রূপকথা, ওমলেট > মামলেট ইত্যাদি।
ii) মধ্য ব্যঞ্জনাগমঃ
শব্দের মাঝে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে মধ্য বানাগম বলে।
যেমন-অম্ল অম্বল, বানর > বান্দর ইত্যাদি।
iii) অন্ত্য ব্যঞ্জনাগমঃ
শব্দের অন্তে বা শেষে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে অন্ত্য ব্যঞ্জনাগম বলে।
যেমন—নানা > নানান, বহু > বহুল, খোকা > খোকন, সীমা > সীমানা ইত্যাদি।
শ্রুতধ্বনিঃ
পাশাপাশি বা সন্নিহিত দুটি ধ্বনির উচ্চারণকালে উচ্চারণের অসতর্কতা বা শ্রুতিমাধুর্যের জন্য ওই দুটি ধ্বনির মাঝখানে তৃতীয় একটি ধ্বনির আগমন ঘটলে ধ্বনি পরিবর্তনের সেই নিয়মকে শ্রুতধ্বনি বলে।
যেমন – শৃগাল > শিআল > শিয়াল। মাআ > মায়া ইত্যাদি।
‘য়’ শ্রুতিঃ
দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘য়’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘য়’ শ্রুতি।
যেমন—মাআ > মায়া, সাঅর > সায়র।
‘ব’ শ্রুতিঃ
দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘ব’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ব’ শ্রুতি।
যেমন—নাএ > নাবে, যাআ > যাবা।
‘দ’ শ্রুতিঃ
দুটি ধ্বনির মাঝে ‘দ’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘দ’ শ্রুতি।
যেমন—বানর > বান্দর/বাদর, জেনারেল > জাঁদরেল।
‘র’ শ্রুতিঃ
দুটি ধ্বনির মাঝে ‘র’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘র’ শ্রুতি।
যেমন-পুষ্ট > পুরুষ্ট।
‘হ’ শ্রুতিঃ
দুটি স্বরধ্বনির মাঝে ‘হ’ ধ্বনি শোনা গেলে সেটি ‘হ’ শ্রুতি।
যেমন- বেআরা > বেহারা, রাউল > রাহুল।
ধ্বনিলোপঃ
শব্দের মধ্য থেকে কোনো ধ্বনি লুপ্ত হয়ে গেলে তাকে ধ্বনিলোপ বলে। ধ্বনিলোপ একাধিক কারণে ঘটতে পারে।উচ্চারণের ত্রুটি,শ্বাসাঘাত, দ্রুত উচ্চারণ, অসাবধানতা,অনুকরণ,বাগযন্ত্রের ত্রুটি প্রভৃতি।
ধ্বনিলোপ দু প্রকার। যথা –
ক) স্বরধ্বনিলোপ
খ) ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ।
ক) স্বরধ্বনিলোপঃ
উচ্চারণের কিংবা বাগযন্ত্রের ত্রুটি,শ্বাসাঘাত, অসাবধানতা বা দ্রুত উচ্চারণের কারণে কোনো শব্দ থেকে স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে স্বরধ্বনিলোপ বলে। অবস্থানভেদে স্বরধ্বনিলোপ তিন প্রকার। যথা –
i) আদি স্বরলোপঃ
শব্দের আদি বা প্রথম থেকে কোনো স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে আদি স্বরলোপ বলে।
যেমন- আছিল > ছিল. অলাবু > লাউ ইত্যাদি।
ii) মধ্য স্বরলোপঃ
শব্দের মাঝখান থেকে কোনো স্বরধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে মধ্য স্বরলোপ বলে।
যেমন- কলিকাতা > কলকাতা, নাতিজামাই > নাজামাই, গামোছা > গামছা ইত্যাদি।
iii) অন্ত্য স্বরলোপঃ
শব্দের অন্ত্য স্বর লুপ্ত হলে অন্ত্য স্বরলোপ বলে।
যেমন- রাশি > রাশ, অগ্র > আগ্ ইত্যাদি।
ব্যঞ্জনধ্বনিলোপঃ
একই প্রক্রিয়ায় শব্দ থেকে ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে ব্যঞ্জনধ্বনিলোপ বলে।
যেমন- পাটকাঠি > পাকাঠি, গ্রাম > গাঁ ইত্যাদি।
অবস্থানভেদে তিনপ্রকার এবং সমাক্ষরলোপ।
ক) আদি ব্যঞ্জনলোপঃ
শব্দের আদি ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে আদি ব্যঞ্জনলোপ বলে।
যেমন- স্থান > থান, স্থিতু> থিতু ইত্যাদি।
খ) মধ্য ব্যঞ্জনলোপঃ
শব্দের মধ্য থেকে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে মধ্য ব্যঞ্জনলোপ বলে।
যেমন- ফাল্গুন > ফাগুন, ফলাহার > ফলার ইত্যাদি।
গ) অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপঃ
কোনো শব্দের অন্ত্য বা শেষ থেকে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হলে তাকে অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ বলে।
যেমন- সখী > সই, নাহি > নাই, গাত্র > গা।
সমাক্ষরলোপঃ
কোনো শব্দের মধ্য থেকে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সমাক্ষর বা সমধ্বনির একটি লুপ্ত হলে তাকে সমাক্ষরলোপ বলে।
যেমন- বড়দাদা > বড়দা, ছোটদিদি > ছোটদি, পটললতা > পলতা ইত্যাদি।























