rajnoitik-totter-moulik-dharonasomuho-2nd-semester-political-science

রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর 2nd Semester Political science

রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর 2nd Semester Political science আমাদের WBNOTES.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে প্রদান করা হলো। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নের উত্তরগুলি ভালো করে তৈরি করবে। এখানে দ্বিতীয় সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রদান করা হলো।

আমাদের ওয়েবসাইটের Class Note বিভাগে বিবিধ বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর, Mock Test বিভাগে একাধিক বিষয়ের অসংখ্য মক টেস্ট, Suggestion বিভাগে অধ্যায়ভিত্তিক সাজেশন প্রদান করা হয়। আমাদের সকল আপডেট লাভ করতে নিয়মিত ভিজিট করো আমাদের ওয়েবসাইটটি। 

রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর 2nd Semester Political science : 

 

মান ২ প্রশ্নের উত্তরঃ 

১. রাজনৈতিক তত্ত্ব (Political Theory) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমন একটি সুশৃঙ্খল তাত্ত্বিক শাখা, যেখানে রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতা, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের মতো মৌলিক রাজনৈতিক ধারণাগুলির দার্শনিক ও আদর্শগত বিশ্লেষণ করা হয়। এটি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পর্যালোচনার পাশাপাশি একটি আদর্শ রাজনৈতিক সমাজের রূপরেখা নির্দেশ করে।

২. রাজনৈতিক তত্ত্ব পাঠের দুটি প্রধান উপযোগিতা উল্লেখ করো।

উত্তর: রাজনৈতিক তত্ত্ব পাঠের দুটি প্রধান উপযোগিতা হলো—

  • এটি নাগরিককে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার ও সার্বিক সামাজিক গঠন সম্পর্কে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও যুক্তিবাদী করে তোলে।
  • এটি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক সমস্যার যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং সঠিক মূল্যায়ন করতে সহায়তা করে।

৩. ‘ল্যাটিন শব্দ’ অনুযায়ী স্বাধীনতার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী?

উত্তর: ইংরেজি ‘Liberty’ (স্বাধীনতা) শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Liber’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ‘Liber’ শব্দের অর্থ হলো ‘মুক্ত’ বা সব ধরনের বিধিনিষেধ ও বন্ধন থেকে মুক্তি। সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে স্বাধীনতা বলতে মানুষের ওপর যে-কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত বাহ্যিক বাধার অনুপস্থিতিকে বোঝায়।

৪. ইতিবাচক স্বাধীনতা (Positive Liberty) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ইতিবাচক স্বাধীনতা বলতে ব্যক্তিমানুষের আত্মবিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের উপযোগী অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উপস্থিতিকে বোঝায়। এই ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যক্তির উন্নতির পথ সুগম করে এবং স্বাধীনতাকে অর্থপূর্ণ রূপ দেয়।

৫. নেতিবাচক স্বাধীনতা (Negative Liberty) কাকে বলে?

উত্তর: নেতিবাচক স্বাধীনতা বলতে ব্যক্তির কার্যকলাপে রাষ্ট্র বা সমাজের বাহ্যিক হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিকে বোঝায়। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো— রাষ্ট্র ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না এবং ব্যক্তিকে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে দিতে হবে।

৬. জন স্টুয়ার্ট মিল কীভাবে কাজকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন?

উত্তর: জে. এস. মিল তাঁর ‘On Liberty’ গ্রন্থে মানবীয় আচরণ বা কাজকে দুভাগে ভাগ করেছেন—

  • স্ব-সম্পর্কিত কাজ (Self-regarding actions): যেসব কাজের প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের ওপর পড়ে।
  • পর-সম্পর্কিত কাজ (Other-regarding actions): যেসব কাজের প্রভাব সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের ওপর পড়ে।

৭. মিলের ‘ক্ষতিসাধন নীতি’ (Harm Principle) কী?

উত্তর: মিলের মতে, কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতা ও স্বাধীন কর্মকাণ্ডে সমাজ বা রাষ্ট্র তখনই বৈধভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে, যখন সেই ব্যক্তির কাজের দ্বারা সমাজের অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একেই মিলের ক্ষতিসাধন নীতি বলা হয়।

৮. রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনায় এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়ার অধিকারকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে। যেমন— ভোটদানের অধিকার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার এবং সরকারি কাজের সমালোচনা করার অধিকার।

৯. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে কী বোঝো?

উত্তর: অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অনাহার থেকে মুক্তি এবং জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত পরিবেশকে বোঝায়। প্রতিটি নাগরিকের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়ার ও ন্যায্য মজুরি লাভের নিশ্চয়তাই হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।

১০. সাম্যের (Equality) ধারণার মূল তাৎপর্য কী?

উত্তর: সাম্য বলতে সমাজে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ও বৈষম্যহীন সুযোগ-সুবিধাকে বোঝায়। সাম্য মানে সকলের জন্য যান্ত্রিক একরূপতা নয়, বরং বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণির বিলোপ।

@ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর – WBNOTES.IN

১১. আইনি সাম্য (Legal Equality) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: আইনি সাম্য বলতে দুটি মূল বিষয়কে বোঝায়—

  • আইনের চোখে সবাই সমান: পদমর্যাদা নির্বিশেষে দেশের সাধারণ আইনের অধীন সকলে সমান।
  • আইন কর্তৃক সমান সুরক্ষা: একই পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইন কোনো অযৌক্তিক পক্ষপাতিত্ব করবে না।

১২. সুযোগের সমতা (Equality of Opportunity) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: সুযোগের সমতা বলতে বোঝায় যে প্রতিটি ব্যক্তি তার আত্মবিকাশ, প্রতিভা ও দক্ষতার পূর্ণ প্রকাশের জন্য সমাজে কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক বাধা ছাড়া সমান পরিবেশ ও অনুকূল পরিকাঠামো লাভ করবে।

১৩. ইতিবাচক বৈষম্য বা সংরক্ষণের যৌক্তিকতা কী?

উত্তর: ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া, অনগ্রসর বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের জন্য প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্র বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা সংরক্ষণ প্রদান করে। এটি সমতার নীতি লঙ্ঘন করে না, বরং বাস্তবসম্মত সাম্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।

১৪. স্বাধীনতা ও সাম্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে দুটি ভিন্ন অভিমত উল্লেখ করো।

উত্তর: স্বাধীনতা ও সাম্যের সম্পর্ক নিয়ে দুটি বিপরীত মত রয়েছে—

  • লর্ড অ্যাক্টন ও টকভিলের মতে, স্বাধীনতা এবং সাম্য পরস্পরবিরোধী; কারণ অবাধ স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণহীন বৈষম্যের সৃষ্টি করে।
  • হ্যারল্ড লাস্কি ও আর. এইচ. টনির মতে, সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন এবং স্বাধীনতা ছাড়া সাম্য অসম্ভব; অর্থাৎ তারা পরস্পরের পরিপূরক।

১৫. সামাজিক ন্যায়বিচার (Social Justice) কাকে বলে?

উত্তর: সামাজিক ন্যায়বিচার হলো এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে জন্ম, জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম বা বিত্তের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক অংশের অধিকার নিশ্চিত করে সার্বিক কল্যাণ সাধন করা হবে।

@ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর – WBNOTES.IN

১৬. বন্টনমূলক ন্যায়বিচার (Distributive Justice) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: বন্টনমূলক ন্যায়বিচার বলতে সমাজে সম্পদ, সম্মান, সুযোগ ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের নীতিকে বোঝায়। অ্যারিস্টটলের মতে, যার যেমন যোগ্যতা ও সমাজে অবদান, সে অনুযায়ী সম্মান বা সম্পদের বণ্টন হওয়াই হলো বন্টনমূলক ন্যায়বিচার।

১৭. জন রলসের ‘অজ্ঞতার পর্দা’ (Veil of Ignorance) তত্ত্বের মূল কথা কী?

উত্তর: জন রলসের মতে, ন্যায়সঙ্গত সমাজের নীতি নির্ধারণের জন্য মানুষকে এমন এক কাল্পনিক আদিম পরিস্থিতিতে কল্পনা করতে হবে যেখানে কেউ নিজের জাতি, ধর্ম, শ্রেণি, সামাজিক অবস্থান বা বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকবে না। এই অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে বসে মানুষ নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত নিয়ম তৈরি করতে সক্ষম হবে।

১৮. জন রলসের ন্যায়তত্ত্বের দুটি মূল নীতি কী কী?

উত্তর: রলসের দুটি প্রধান নীতি হলো—

  • সমান মৌলিক স্বাধীনতার নীতি: প্রতিটি ব্যক্তি সর্বাধিক মৌলিক স্বাধীনতার সমান অধিকারী হবে।
  • পার্থক্য নীতি ও সুযোগের সমতা নীতি: সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়।

১৯. অধিকার (Rights) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: অধিকার হলো সমাজজীবন ও রাষ্ট্রের স্বীকৃত এমন কিছু মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল পরিস্থিতি, যা ছাড়া কোনো ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীন বিকাশসাধন করতে পারে না। অধ্যাপক লাস্কির মতে, অধিকার হলো সমাজজীবনের সেইসব শর্তাবলি যা ছাড়া ব্যক্তি নিজের পূর্ণ রূপ প্রকাশ করতে পারে না।

২০. প্রাকৃতিক অধিকার তত্ত্বের (Natural Rights Theory) মূল বক্তব্য কী?

উত্তর: এই তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, মানুষ রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বেই প্রকৃতির রাজ্যে জন্মসূত্রে কিছু অলঙ্ঘনীয় ও জন্মগত অধিকার লাভ করেছে। জন লকের মতে এই অধিকারগুলি হলো— জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার, যা কোনো রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না।

@ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর – WBNOTES.IN

 

মান ৬ প্রশ্নের উত্তরঃ  

প্রশ্ন ১: স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়? ইতিবাচক স্বাধীনতা ও নেতিবাচক স্বাধীনতার মধ্যকার মূল পার্থক্যগুলি আলোচনা করো। (২+৪=৬)

উত্তর:

ভূমিকা ও স্বাধীনতার সংজ্ঞা:

সাধারণ অর্থে স্বাধীনতা বলতে মানুষের ইচ্ছামতো যে-কোনো কাজ করার অধিকার এবং বাহ্যিক বাধানিষেধের অনুপস্থিতিকে বোঝায়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অবাধ বা নিয়ন্ত্রণহীন কাজকে স্বাধীনতা বলা হয় না, কারণ তা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা হলো এমন এক অনুকূল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের উপস্থিতি, যেখানে রাষ্ট্রীয় আইনের সীমার মধ্যে থেকে প্রতিটি ব্যক্তি নিজের সুপ্ত গুণাবলি ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটাতে পারে। অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির ভাষায়— স্বাধীনতা হলো সমাজজীবনের সেই অনুকূল পরিবেশের সযত্ন সংরক্ষণ, যেখানে সাধারণ মানুষ তার ব্যক্তিসত্তাকে সর্বোত্তম রূপে বিকশিত করতে পারে।

ইতিবাচক ও নেতিবাচক স্বাধীনতার মধ্যকার মূল পার্থক্য:

রাজনৈতিক তত্ত্বে স্বাধীনতাকে দুটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়— ইতিবাচক স্বাধীনতা এবং নেতিবাচক স্বাধীনতা। বার্লিন, মিল, গ্রিন প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের চিন্তার আলোকে এই দুই ধারণার পার্থক্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ধারণাগত ও প্রকৃতিগত পার্থক্য:
নেতিবাচক স্বাধীনতা মূলত ব্যক্তির কার্যকলাপে রাষ্ট্রীয় বা বাহ্যিক বাধার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে। এর মূল বক্তব্য হলো— ব্যক্তিকে তার মতো ছেড়ে দেওয়া হোক। পক্ষান্তরে, ইতিবাচক স্বাধীনতা কেবলমাত্র বাধার অনুপস্থিতি নয়, বরং ব্যক্তিত্বের পূর্ণবিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল সামাজিক পরিকাঠামোর সক্রিয় উপস্থিতিকে নির্দেশ করে।

২. রাষ্ট্রের ভূমিকা ও পরিধি:
নেতিবাচক স্বাধীনতার প্রবক্তারা (যেমন জন লক, অ্যাডাম স্মিথ, হারবার্ট স্পেন্সার) রাষ্ট্রকে একটি ‘প্রয়োজনীয় অনিষ্ট’ মনে করেন। তাঁদের মতে রাষ্ট্র কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষা করবে, ব্যক্তির স্বাধীন কর্মে কোনো রূপ হস্তক্ষেপ করবে না। অন্যদিকে, ইতিবাচক স্বাধীনতার প্রবক্তারা (যেমন টি. এইচ. গ্রিন, হ্যারল্ড লাস্কি) রাষ্ট্রকে একটি জনকল্যাণমূলক ও সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে স্বাধীন বিকাশের পথকে সুগম করে।

৩. আইনের সাথে স্বাধীনতার সম্পর্ক:
নেতিবাচক ধারণায় আইন ও স্বাধীনতাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে ধরা হয়। এই মত অনুসারে, আইন যত বেশি বাড়বে, ব্যক্তির স্বাধীনতা ততটাই সংকুচিত হবে। অপরদিকে ইতিবাচক ধারণায় আইন হলো স্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষক ও পৃষ্ঠপোষক। সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত আইন ব্যক্তির অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং দুর্বলের স্বাধীনতাকে বলবানের গ্রাস থেকে রক্ষা করে।

৪. সাম্য ও সামাজিক ন্যায়ের সংযোগ:
নেতিবাচক স্বাধীনতা মূলত আনুষ্ঠানিক সমতা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকে যায়। বিপরীতে, ইতিবাচক স্বাধীনতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এই মতবাদ মনে করে যে দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্ব বজায় থাকলে স্বাধীনতার কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না; তাই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রকৃত স্বাধীনতার পূর্বশর্ত।

 

প্রশ্ন ২: জন স্টুয়ার্ট মিলের স্বাধীনতার তত্ত্বটি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো। মিলের ‘ক্ষতিসাধন নীতি’ (Harm Principle) আলোচনা করো। (৩+৩=৬)

উত্তর:

জে. এস. মিলের স্বাধীনতার তত্ত্ব:

উদারনীতিবাদী চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘On Liberty’ (১৮৫৯)-তে ব্যক্তিস্বাধীনতার সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও যুক্তিনিষ্ঠ দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। মিলের মতে, সমাজের সামগ্রিক প্রগতি এবং ব্যক্তিসত্তার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধনের মূল চালিকাশক্তি হলো অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি। সংখ্যাগুরু সমাজের অন্ধ কুসংস্কার, সামাজিক নৈতিকতা বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ যাতে ব্যক্তির মৌলিক চিন্তা ও বিবেককে দমন করতে না পারে, সেজন্য মিল ব্যক্তিজীবনের সার্বভৌমত্বের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন।

মিল ব্যক্তিস্বাধীনতার বাস্তব প্রয়োগকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানুষের সমস্ত কাজকে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করেছেন:

  • স্ব-সম্পর্কিত কাজ (Self-regarding actions): যেসব কাজের প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের জীবন, শরীর ও মনের ওপর পড়ে, সেগুলিকে স্ব-সম্পর্কিত কাজ বলে (যেমন— খাদ্যাভ্যাস, পোশাক নির্বাচন বা ধর্মীয় বিশ্বাস)। মিলের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে সার্বভৌম; এখানে রাষ্ট্র বা সমাজের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।
  • পর-সম্পর্কিত কাজ (Other-regarding actions): যেসব কাজের প্রত্যক্ষ প্রভাব সমাজের অন্যান্য মানুষের জীবন, নিরাপত্তা বা অধিকারের ওপর গিয়ে পড়ে, সেগুলিকে পর-সম্পর্কিত কাজ বলা হয় (যেমন— চুরি, মারামারি, অন্যের পথ আটকানো ইত্যাদি)। এই জাতীয় কাজের ক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যক্তির আচরণের ওপর যুক্তিযুক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।

মিলের ক্ষতিসাধন নীতি (Harm Principle):

সমাজ বা রাষ্ট্র ঠিক কতটুকু পর্যন্ত একজন ব্যক্তির স্বাধীনতায় বৈধভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তার সীমারেখা নির্ধারণের জন্য মিল যে নীতি প্রণয়ন করেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ক্ষতিসাধন নীতি’ নামে পরিচিত।

১. নীতির মূল প্রতিপাদ্য:
মিলের মতে, সভ্য সমাজের কোনো সদস্যের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার স্বাধীনতার ওপর বৈধ ক্ষমতা প্রয়োগের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে আত্মরক্ষা বা অপরের প্রতি ক্ষতিসাধন রোধ করা। কোনো ব্যক্তি যদি কেবল নিজের ক্ষতি করে, তবে তাকে উপদেশ বা অনুরোধ করা যেতে পারে, কিন্তু জোর করে বাধ্য করা যায় না। কেবল তখনই রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করতে পারে, যখন তার আচরণ দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে অপরের ক্ষতি সাধিত হয়।

২. বাক ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা:
ক্ষতিসাধন নীতির মাধ্যমে মিল মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছেন। কোনো ভিন্নমত প্রচলিত ধ্যানধারণার বিরোধী হলেও রাষ্ট্র তাকে দমন করতে পারে না। কারণ সংখ্যাগুরু সমাজ ক্ষুব্ধ হলেই কারও মতপ্রকাশে ক্ষতি সাধিত হয় না; একমাত্র হিংসাত্মক প্ররোচনা ছাড়া মতপ্রকাশকে নিষিদ্ধ করা অন্যায়।

৩. আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্য:
মিলের এই ক্ষতিসাধন নীতি আধুনিক সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করেছে। রাষ্ট্র যাতে খেয়ালখুশিমতো নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরে ও গোপনীয়তায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তার এক শক্তিশালী দার্শনিক সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি করেছে এই নীতি।

@ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর – WBNOTES.IN

প্রশ্ন ৩: জন রলসের ন্যায়বিচার তত্ত্বটি (Theory of Justice) আলোচনা করো। (৬)

উত্তর:

ভূমিকা ও রলসের মূল লক্ষ্য:

আমেরিকান রাজনৈতিক দার্শনিক জন রলস তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘A Theory of Justice’ (১৯৭১)-এর মাধ্যমে সমকালীন রাজনৈতিক দর্শনে ন্যায়বিচারের ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি উপযোগিতাবাদীদের “সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখ” নীতির বিরোধিতা করেন; কারণ উপযোগিতাবাদে বৃহত্তর স্বার্থের নামে সংখ্যালঘু বা দুর্বল মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। রলস এমন এক ন্যায়তত্ত্ব গড়ে তুলতে চেয়েছেন যা প্রতিটি ব্যক্তির সমান মর্যাদা ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়।

রলসের ন্যায়তত্ত্বের মূল স্তম্ভসমূহ:

১. আদিম অবস্থান (Original Position):
ন্যায়সঙ্গত নীতি নির্ধারণের জন্য রলস সামাজিক চুক্তি মতবাদের অনুকরণে একটি কাল্পনিক কাঠামোর অবতারণা করেছেন, যার নাম ‘আদিম অবস্থান’। এখানে সমাজের সকল সদস্য সমবেত হয়ে সমাজের মৌলিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বণ্টনের নিয়মাবলি ঠিক করার জন্য চুক্তিতে উপনীত হন।

২. অজ্ঞতার পর্দা (Veil of Ignorance):
আদিম অবস্থানে থাকা মানুষরা একটি ‘অজ্ঞতার পর্দা’-র আড়ালে অবস্থান করবেন। এর অর্থ হলো, চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তিই জানবেন না সমাজে তাঁর নিজের অবস্থান কী হবে— তিনি ধনী হবেন না দরিদ্র, উচ্চবর্ণের হবেন না নিম্নবর্ণের, সুস্থ হবেন না প্রতিবন্ধী। এই অজ্ঞতার কারণে কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থের কথা ভেবে একপেশে নিয়ম বানাতে পারবেন না; বরং তিনি এমন নিয়ম তৈরি করতে চাইবেন যাতে সমাজে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটিও সুরক্ষিত থাকে।

৩. রলসের ন্যায়বিচারের দুটি মৌলিক নীতি:
অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে বসে যুক্তিবাদী মানুষেরা সর্বসম্মতিক্রমে দুটি মৌলিক নীতিতে উপনীত হবেন:

ক) সমান মৌলিক স্বাধীনতার নীতি (Equal Basic Liberty Principle): প্রতিটি ব্যক্তির এমন কিছু সর্বাধিক ব্যাপক মৌলিক রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতা থাকবে, যা সমাজের অন্য সবার অনুরূপ স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন— মতপ্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা।

খ) দ্বিতীয় নীতি (সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ): সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা দুটি শর্ত পূরণ করবে:

      • সুযোগের ন্যায্য সমতা (Fair Equality of Opportunity): সমস্ত পদ ও পদমর্যাদা সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে।
      • পার্থক্য নীতি (Difference Principle): সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য এমনভাবে পুনর্বণ্টন করতে হবে, যাতে সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া অংশ (Least Advantaged) সর্বাধিক লাভবান হয়।

উপসংহার ও গুরুত্ব:

জন রলসের এই তত্ত্বকে ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায়বিচার’ (Justice as Fairness) বলা হয়। রলস দেখিয়েছেন যে সামাজিক অসমতা থাকা সত্ত্বেও যদি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়, তবেই সেই সমাজ একটি ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শ সমাজ হিসেবে পরিগণিত হবে।

PDF DOWNLOAD LINK (Preview Copy)

শিল্পবিপ্লব, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ

রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ প্রশ্নের উত্তর – উপরের ফাইলটিতে অল্প কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। নিম্নের PDF ফাইলটিতে এই অধ্যায়ের সমস্ত প্রশ্ন উত্তরসহ শুধুমাত্র আমাদের Subscribers -দের জন্য প্রদান করা হলো। একাদশ শ্রেণির নোট সাবস্ক্রিপশন নিতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথেঃ What’s App: 7001880232

১) মান ২ প্রশ্নের উত্তর – ৫০টি (Only for Subscribers) 

Click here to view pdf file

২) মান ৬ প্রশ্নের উত্তর – ৬টি (Only for Subscribers) 

Click here to view pdf file

একাদশ শ্রেণির সমস্ত বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর দেখতে নিম্নের ছবিতে ক্লিক/টাচ করতে হবে

রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ

 

আমাদের কথাঃ পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সকল শিক্ষার্থীদের অনলাইন পড়াশোনায় সহায়তা প্রদান করাই আমাদের লক্ষ্য।

পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষাবিজ্ঞান, দর্শন, সংস্কৃত প্রভৃতি বিষয়ে অনলাইন সহায়তা প্রদান করা হবে। @ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ – WBNOTES.IN

আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের WBNOTES.IN ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন আলোচনা প্রদান করবার প্রচেষ্টা করে চলেছি। সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ- আপনারা আপনাদের পরিচিতদের সাথে আমাদের WBNOTES.IN ওয়েবসাইটটিকে শেয়ার করবেন। @ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ – WBNOTES.IN

আমাদের লক্ষ্যঃ পশ্চিমবঙ্গের সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় বিবিধ বিষয়ের একটি সুসংগঠিত অনলাইন শিক্ষা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। আর্থিকভাবে অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা যেমন বিনামূল্যে জ্ঞানার্জনের সুবিধা প্রদান করেছি; আবার মাননীয় শিক্ষকদের সুবিধার্থে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা প্রস্তুতি প্রদানের লক্ষ্যে আমাদের WBNOTES.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে প্রদান করা হচ্ছে নরমাল ও প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন। আমাদের সাবস্ক্রীপশন পেজে আপনারা এই সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য পেয়ে যাবেন। @ রাজনৈতিক তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ – WBNOTES.IN

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কপি করার প্রচেষ্টা করবেন না !
Scroll to Top